• সর্বশেষ আপডেট

    ইমরান ও তাঁর সমর্থকেরা সেনাবাহিনীর ওপর খেপা কেন?

     

    ৯ মে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ইসলামাবাদের হাইকোর্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেন দেশটির আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। এরপরই দেশজুড়ে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা শুরু করেন ইমরানের সমর্থকেরা। তাঁদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল দেশটির সেনাবাহিনী। ইমরানকে গ্রেপ্তারের পর ভাইরাল হওয়া ৩৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, লাহোরের একটি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করছেন একদল ক্ষুব্ধ মানুষ। লাঠি হাতে তাঁরা ভাঙচুর করছেন, আর ইমরানের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছেন। এটি ছিল এক সেনা কর্মকর্তার বাসভবন। ভিডিওটি যিনি ধারণ করছিলেন, ক্যামেরা হাতে নিয়ে তিনি ওই বাড়িতে অবস্থান করা এক সৈনিকের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় ওই সৈনিককে উদ্দেশ করে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা আগেই বলেছিলাম, ইমরান খানকে স্পর্শ করবেন না।’  শুধু এ ঘটনাই নয়, একই সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের অন্য প্রদেশেও বিভিন্ন সেনা স্থাপনা ও সেনা কর্মকর্তাদের বাসভবনে হামলা, এমনকি অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট ইমরানের গ্রেপ্তারকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং তাঁকে আদালতে হাজির করে মুক্তির নির্দেশ দেন। ইমরানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে পেশোয়ার ক্যান্টনমেন্টে হামলা করে তার সমর্থকেরা। ছবি: সংগৃহীতএরই ধারাবাহিকতায়, গতকাল শুক্রবার ইসলামাবাদ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ তাঁর দুই সপ্তাহের জামিন মঞ্জুর করেন। মুক্তি পেয়ে ইমরান খানও তাঁর গ্রেপ্তারের জন্য সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে দায়ী করেন। দেশটির সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে ইমরান ও তাঁর সমর্থকদের বিরোধ এখন তুঙ্গে। 
     


    কিন্তু এর শুরুটা হলো কীভাবে? দেখা গেছে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনবার অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটিয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তিন দশকেরও বেশি সময় তারা রাষ্ট্রক্ষমতা নিজেদের দখলে রেখেছে। এমনকি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তাদের অনেক প্রভাব রয়েছে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ইমরানের দল পিটিআই ক্ষমতায় আসার পেছনেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেছিল নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও বিরোধীরা। কেউ কেউ এমন দাবিও করেছিলেন, ভোট ডাকাতি করে ইমরানকে ক্ষমতায় এনেছে সেনাবাহিনী। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায়ও ইমরান খানের সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই দেখা গেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত এই সম্পর্কে ফাটল ধরে। মূলত দেশটির বৈদেশিক নীতি নিয়েই এই ফাটলের সূত্রপাত ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারানোর পর এর জন্য সরাসরি সেনাবাহিনীকে দায়ী করেন ইমরান খান। তাঁর অনুসারীরাও এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন।এ বিষয়ে লাহোরে আবদুল আজিজ নামে ইমরানের এক সমর্থক সাংবাদিকদের বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দেশে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন ইমরান খান। এটা ছিল এই দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা ভেবেছিলাম, সেনাবাহিনীও এটি বুঝতে পেরেছে। কিন্তু অনাস্থা ভোটে যা ঘটে, তা ছিল কল্পনারও অতীত। কখনোই ভাবিনি দেশে এমন পরিস্থিতি আসবে।’ লাহোরে উচ্চ পদস্ত সেনা কর্মকর্তার বাড়িতে হামলার পর এভাবেই আগুন ধরিয়ে দেয় ইমরান খানের সমর্থকরা। ছবি: সংগৃহীতক্ষমতা হারানোর পর দ্রুত আরেকটি নির্বাচনের দাবিতে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ করেন ইমরান ও তাঁর দলের সমর্থকেরা। নভেম্বরে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে একবার হত্যাচেষ্টাও হয়। এ সময় ইমরান দাবি করেন, সরকার ও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা তাঁকে হত্যার চেষ্টা করছেন। সর্বশেষ গ্রেপ্তারের ঘটনাটিও সেনাবাহিনীর নির্দেশে শাহবাজ শরিফের সরকার ঘটিয়েছে বলে দাবি করছেন ইমরান খানের সমর্থকেরা। দেশটির খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বাসিন্দা আবদুল্লা আফ্রিদি বলেন, ‘যত দিন সেনাবাহিনী সংবিধান মানছিল এবং আমাদের নেতার পাশে ছিল, তত দিন আমরাও তাদের পাশে ছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম ভালো-মন্দের বিচারের ক্ষমতা তাদের আছে। কিন্তু যখন দেখলাম সেনাবাহিনী ইমরান খান ও তাঁর আদর্শের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে এবং আমাদের মুখ বন্ধ করতে চাইছে—তখন থেকে আমরাও তাদের বিরোধিতা করছি।’ সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের সমর্থকদের বিরোধ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এ অবস্থায় পিটিআই সমর্থকেরা জিকির তুলেছে, ‘ইমরান খান আমাদের লাল দাগ।’ এই দাগ স্পর্শ করলে অর্থাৎ ইমরানের কিছু হলে তাঁর সমর্থকেরাও ছেড়ে কথা বলবে না। সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহও সেই ইঙ্গিত দিয়েছে।
    প্রকাশিত শনিবার ১৩ মে ২০২৩