• সর্বশেষ আপডেট

    অবৈধ দখলে থাকা রেলওয়ের জমি উদ্ধারে বাধা

     

    নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমী (আরটিএ) হালিশহর চট্টগ্রামে অবস্থিত। এই একাডেমীর মোট জমির পরিমাণ, লাইসেন্স দেয়া জমির পরিমাণ, অবৈধ দখলে থাকা জমির পরিমাণ, অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা, জমি নিয়ে রুজুকৃত মামলার সংখ্যা ও মামলার সর্বশেষ অবস্থার বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রাণালয়ে ১০ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়।

    এতে রেলপথ মন্ত্রানালয়ের সাবেক সচিব মোফাজ্জেল হোসেনের অনুরোধে সাবেক যুগ্ম-সচিব (আইন ও ভূমি) রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির সাবেক রেক্টর (আরটিএ) চট্টগ্রাম কর্তৃক প্রেরিত কার্যপত্রের তথ্যাদি বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।

    তখন—বৈঠকে যুগ্ম-সচিব জানান যে, বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমী (আরটিএ) হালিশহরের মোট জমির পরিমাণ ছিল ৯১.৩৯ একর। ২০০৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২৩ একর জমি দখলে নিয়ে আবাসিক এলাকা তৈরি করে। সেই জমি বাদে বর্তমানে আরটিএ এর জমির পরিমাণ দাড়ায় ৬৮.৩৯ একর। এর মধ্যে ৪২.৪৯ একর উচু এবং জলাশয়ের পরিমাণ ২৫.৯০ একর।

    ২৫.৯০ একর এই জলাশয়টি বিগত ৭ এপ্রিল ২০১৫ সালে ৫ বছর মেয়াদে সিলভার জুবিলী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শাহ আলমকে লীজ প্রদান করে রেলওয়ে। লীজ চুক্তির মেয়াদটি ছিল গত ৪ এপ্রিল ২০২০ সাল পর্যন্ত। এবং নার্সারীর জন্য ১.২১ একর ভূমি একই সিলভার জুবিলী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহ আলমকে লীজ প্রদান করা হয়। এরপর লীজের মেয়াদ শেষ হলে তিনি লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন না করায় গত ২০ জুন ২০১৯ তারিখে নার্সারীর লীজ চুক্তিটি বাতিল করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।তিনি আরও উল্লেখ করেন, রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমীর পরিত্যক্ত কোয়ার্টার নং-১৩/বি (১৬ ইউনিট) একই ব্যক্তি সিলভার জুবিলী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শাহ আলমকে গত ২৩ আগষ্ট ২০১৫ তারিখে লীজ প্রদান করা হয়। কিন্তু চুক্তিপত্রের শর্তাবলী ভঙ্গ করার কারণে এ চুক্তিপত্রটিও বিগত ৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে বাতিল করা হয়।

    তাছাড়া–রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির পরিত্যক্ত বাংলো নং-৯ সাময়িক ব্যবহারের জন্য বিগত ২০ সেপ্টম্বর ২০১৫ তারিখে সিলভার জুবিলী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহ আলমকে লীজ প্রদান করা হয়। তিনি অবৈধভাবে বাংলোটির অবকাঠামো পরিবর্তন পূর্বক দ্বিতল ভবনে রূপান্তর করার ফলে চুক্তিপত্রের শর্তাবলী ভঙ্গের কারণে গত ৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে এই চুক্তিপত্রটিও বাতিল করা হয়।

    এই বিষয়ে যুগ্ম-সচিব (আইন ও ভূমি) বৈঠকে আরও জানান যে, লীজ গ্রহীতা শাহ আলম আনুমানিক ১০ বছর এই জমি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। তাছাড়া–তিনি অবৈধ ২৮টি স্থাপনা নির্মাণ করেন। অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনায় গরু, ছাগল, ঘোড়া, ভেড়া, গয়াল, হাঁস, মুরগী, কবুতর, খড়গোশ ইত্যাদি খামার করা হয়।

    এছাড়া— শাহ আলম পুকুরের দক্ষিণ পার্শ্বে ঢালাই করে অবৈধভাবে রাস্তা নির্মাণ করেন এবং একটি জলাশয়কে অবৈধভাবে চারটি জলাশয়ে বিভক্ত করেন। জলাশয়টি চুতর্দিকে প্রায় ২০ ফুট করে মাটি দিয়ে অবৈধ ভাবে ভরাট করা হয়। জলাশয়ের লীজ চুক্তি ভঙ্গ করে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকান্ড পরিচালনার দায়ে চুক্তিপত্র বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য তখন আরটিএ কর্তৃক রেলের মহাপরিচালক বরাবর একটি চিঠিও প্রেরণ করা হয়।

    বিষয়টি সিলভার জুবিলী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহ আলমের নজরে এলে চিঠির বিষয়ে লীজকৃত জলাশয়ের উপর হাইকোর্ট বিভাগে গত ২৪ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে একটি রীট পিটিশন নং-৪০১২/২০১৯ দায়ের করেন তিনি। এ প্রেক্ষিতে একই তারিখে অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল ২০১৯ তারিখ হতে পরবর্তী ৬ মাসের জন্য হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ প্রদান করেন। যার মেয়াদ গত ২৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে শেষ হয়েছে।

    এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সাবেক মহাব্যবস্থাপক জানান, রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির বিশাল জমি শাহ আলমকে লীজ প্রদান করেন রেলওয়ে। পরবর্তীতে লীজ গ্রহীতা চুক্তিপত্র ভঙ্গ করে বিভিন্ন অনিয়ম করার কারণে চুক্তি বাতিল করা হয়। বর্তমানে তার অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধার এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলাশয়ের উপর রুজুকৃত মামলায় স্থগিতাদেশ হাইকোর্ট বিভাগ থেকে প্রত্যাহার আদেশ নিয়ে জলাশয়ের লীজ চুক্তিটিও বাতিল করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

    এ বিষয়ে সাবেক আইন কর্মকর্তা (পূর্ব) জানান, ইতোমধ্যে লীজ গ্রহীতা সিলভার জুবিলী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহ আলম মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে জলাশয়ের উপর যে একটি রীট পিটিশন নং-৪০১২/২০১৯ দায়ের করার পর হাইকোর্ট ৬ মাসের জন্য যে স্থগিতাদেশ টি (stay order) প্রদান করেছেন তার মেয়াদ গত ২৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখ শেষ হয়ে গেছে।

    তিনি আরও জানান–লীজ গ্রহীতার স্থগিতাদেশের মেয়াদ যাতে আর না বাড়াতে পারে সে জন্য ২৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখের পূর্বেই মামলাটির স্থগিতাদেশটি প্রত্যাহার (vacate) এর নিমিত্তে প্রচেষ্টা চালানো হবে বলে জানানো হলেও সে প্রচেষ্টা ধামাচাপা পড়ে যায়।

    এ বিষয়ে জানার জন্য সিলভার জুবলী লিমিটেডের (এমডি) মোহাম্মদ শাহ আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লীজ বাতিলের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে আমি হাইকোর্টে একটি রীট পিটিশন দায়ের করেছি। যার নাম্বার–১১৪৬৪/২০১৯। এবং এই রীট পিটিশনের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর ২০২৩ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করেছে হাইকোর্ট।

    বুধবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, লীজ গ্রহীতা সিলভার জুবিলী কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহ আলম আরটিএর যে সমস্ত জমি অবৈধ দখলে রেখেছেন এবং যে সমস্ত অবৈধ স্থাপনাসমূহ তৈরি করেছেন, সে সমস্ত অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধারের জন্য ভারপ্রাপ্ত রেক্টর আতাউল হক ভূঞা ও আরটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ট্রেনিং একাডেমির দেয়াল ঘেরা জমির অবস্থা দেখার জন্য ভিতরে প্রবেশ করতে গেলে শাহ আলমের লোকদের সঙ্গে বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। এনিয়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে সেখানে।

    এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত রেক্টর আতাউল হক ভূঞা বলেন, ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রীর কয়েকটি চুক্তি অনুযায়ী রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি হালিশহর ভারতীয় রেলওয়ে ট্রেনিং ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা ও কর্মীদের জন্য ট্রিনিং প্রোগ্রাম প্রদান করবে। এর মধ্যে থাকবে নকশা প্রণয়ন, সমন্বয়, সেমিনার পরিচালনা, কর্মশালা, শ্রেণীকক্ষ এবং ফিল্ড প্রশিক্ষণ।

    জলাশয়ের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সিলভার জুবিলী কনস্ট্রাকশনের ম্যানেজার মুশফিকুর রহমান মাশফী বলেন, ‘গেট তালাবদ্ধ থাকলে ভেতরে ঢুকতে ভারপ্রাপ্ত রেক্টরের সঙ্গে থাকা লোকজন তালা ভাঙার চেষ্টা করেন।’ সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর রফিক উল্লাহ বলেন, ‘জলাশয়ের জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য ঢুকতে চাইলে বাধা দেন লিজগ্রহীতার লোকজন।’

    তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালে পাঁচ বছরের জন্য জলাশয়টি লিজ নিই। ২০২০ সালের এপ্রিলে লিজের মেয়াদের শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই রেল কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ না দিয়ে আমার লিজ বাতিল করে দেয়। এরপর আমি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হই। আদালত আমাকে লিজ বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেন। সর্বশেষ এ বছরের সেপ্টেম্বরে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এটি বাড়াতে আবেদন করলে আদালত গত ২৮ আগস্ট শুনানিতে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ান।’

    এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত রেক্টর আতাউল হক ভূইয়া বলেন, ‘আরটিএ দপ্তরে আদালতের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কোনো কাগজ নেই। থাকলে তা পরে দেখবো।’ তবে তিনি জলাশয়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার জন্যই কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে জলাশয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানান। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রেক্টর আমার অধীনে না, বিষয়টি ভারপ্রাপ্ত রেক্টর ভালো বলতে পারবেন।’

    সিলভার জুবলী লিমিটেডের (এমডি) মোহাম্মদ শাহ আলমের অভিযোগ উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও চট্টগ্রামের রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির (আরটিএ) জলাশয়ে ঢুকার চেস্টা করেন ভারপ্রাপ্ত রেক্টর। এ সময় লিজগ্রহীতার লোকজনদের বাধার মুখে তিনি ঢুকতে না পেরে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করেন জলাশয়ের গেটমুখে। তবে ভারপ্রাপ্ত রেক্টর জলাশয়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে গিয়েছিলেন বলে জানান। একই সঙ্গে আদালতের নিষেধাজ্ঞা আদেশের কোনো কাগজ দপ্তরে নেই বলেও জানান তিনি।
    প্রকাশিত শনিবার ০১ অক্টোবর ২০২২