Header Ads

parkview
  • সর্বশেষ আপডেট

    কবরস্থানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওয়্যারহাউজ

      

    রাজধানীর খিলগাঁওয়ে অবস্থিত তালতলা কবরস্থান। তিনদিকে সীমানা দেয়াল দেওয়া কবরস্থানের ফটক দিয়ে ঢুকে সামনে এগিয়ে হাতের ডানদিকে অর্থাৎ দক্ষিণ পাশে চোখে পড়বে সরু একটা রাস্তা, যার দুই পাশে সারি সারি কবর। রাস্তার শেষ সীমানায় রয়েছে নীল রঙের একটি উঁচু ঘর। ঘরটি দেখে মনে হতে পারে লাশ গোসলের ঘর। কিন্তু না, এটা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুর্যোগ সাড়াদান কার্যক্রম পরিচালনার জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ওয়্যারহাউজ! সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে রাখা যন্ত্রপাতি নিয়েই দুর্যোগকালে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হবে। এখানেই হবে সেই কার্যক্রমের প্রশিক্ষণ।

    সিটি করপোরেশনের সূত্রমতে, ওয়্যারহাউজে আছে উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর বিদ্যুৎচালিত হাতুড়ি, পাথর কাটার যন্ত্র, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রসহ ৫২ ধরনের যন্ত্রপাতি। এছাড়া জেনারেটর, অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়িও এখানে থাকার কথা। এছাড়া ওয়্যারহাউজেই থাকবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। সেখানে থাকবে কম্পিউটারসহ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী প্রযুক্তি। আর এখানেই হবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ।

    তবে গত ২৭ জুলাই সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ওয়্যারহাউজে অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ি ঢোকানো বা বের করা এবং প্রশিক্ষণ নেওয়ার কোনও উপযুক্ত জায়গা নেই।

    জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ঢাকায় দুর্যোগ মোকাবিলায় ২০১৫ সালে ৮১২ কোটি টাকার আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে দুই সিটি করপোরেশনের জন্য আটটি জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ওয়্যারহাউজ তৈরি করা হয়।

    ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মিরপুর-২, মিরপুর-১০, কারওয়ান বাজার, মহাখালী ও উত্তরা অঞ্চলে একটি করে জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ওয়্যারহাউজ স্থাপন করা হয়।

    আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পাশে, খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানে ও আজিমপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে ওয়্যারহাউজ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়্যারহাউজ তৈরি ও মালামাল বাবদ ৯০ লাখ টাকা খরচ হয়।

    এখন প্রশ্ন উঠেছে কীভাবে কবরস্থানের মতো জায়গায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওয়্যারহাউজ স্থাপন হয়? জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটির খিলগাঁও অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ওয়্যারহাউজটি নির্মাণ করা হয়েছে।’

    খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুই সিটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য নির্মিত ওয়্যারহাউজ স্থাপনের প্রকল্পের উপ-পরিচালক হিসেবে প্রথম থেকে জড়িত ছিলেন দক্ষিণ সিটির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম।

    তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, কবরের পাশে এসটিএস (ময়লা রাখার ঘর) আছে। তার পাশে করা হয়েছে ওয়্যারহাউজটি। এরপরে ছিল কবরের সীমানা দেয়াল। আর যখন পরিকল্পনা করা হয় তখন সীমানা প্রাচীরের বাইরে ওয়্যারহাউজটি করার কথা ছিল।  

    তিনি আরও বলেন, ‘এটা করা হয়েছে আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্পের মাধ্যমে। এর প্রকল্প পরিচালক উত্তর সিটি করপোরেশনের। দক্ষিণের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব আমার। তবে প্রকল্প পরিচালক ও বাস্তবায়ন সবই উত্তর সিটি করপোরেশন করেছে।’

    তবে তিনি দাবি করেন, ওয়্যারহাউজটি কবরের সীমানা প্রাচীরে বাইরে এবং এর ঢোকার রাস্তাও আলাদা।

    কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, কবরস্থানের ফটক ছাড়া ওই ওয়্যারহাউজে প্রবেশে আলাদা কোনও রাস্তা নেই। স্থাপনাটির পেছনে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ি ও একটি ময়লা রাখার ঘর রয়েছে।

    এ বিষয়ে  জানতে দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদের ফোনে একাধিক কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

    এদিকে শুধু কবরস্থানে নয়, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের উত্তরা-৬ সেক্টরের অন্তর্গত বীর উত্তম জিয়াউর রহমান সড়কের ওপরও করা হয়েছে এমন আরেকটি ওয়্যারহাউজ। আর ওই স্থাপনার পেছনেই রয়েছে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) উড়াল সড়কের র‌্যাম্প। যে কারণে এই ওয়্যারহাউজটিও ভাঙার কথা চলছে।

    উত্তর সিটির উত্তরা অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা জুলকার নয়ন জানান, বাস র্যাপিড ট্রানজিটের উন্নয়ন কাজের জন্য ওয়্যারহাউজটি ভেঙে ফেলতে হবে।

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী বলেন, আগেই জানা ছিল ওয়্যারহাউজটি ভাঙতে হবে। কারণ, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্প ২০১২ সালে শুরু হয়, আর আরবান রিজিলিয়েন্স প্রজেক্ট শুরু হয় ২০১৫ সালে। তবু কেন এমন জায়গায় ওয়্যারহাউজ করা হয়েছে তা ঊর্ধ্বতনরাই ভালো বলতে পারবেন।

    এছাড়াও কারওয়ান বাজারে ঘিঞ্জি এলাকায় আরও একটি ওয়্যারহাউজ তৈরি করা হয়েছে। সেখানেও প্রবেশ করা কঠিন।

    এসব বিষয়ে উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, ‘উত্তরার ওয়্যারহাউজ নিয়ে আলোচনা চলছে। চেষ্টা করছি যাতে সরানো না হয় এবং সরানো হলেও যেন কম ক্ষতি হয়। আর তারা কোন প্রেক্ষাপটে একটি প্রকল্প চলমান থাকার পরও সেই জায়গায় এ ধরনের স্থাপনা গড়ে তুললো, সে বিষয়েও আমরা জানার চেষ্টা করছি।’

    জরুরি সময়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গড়ে তোলা স্থাপনাগুলোই এখন মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। কিন্তু কেন এমন হলো, জানতে চাইলে প্রকল্পের তৎকালীন পরিচালক ও ঢাকা উত্তর সিটির সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তারেক বিন ইউসুফ বলেন, ‘কবরস্থানের ভেতরে কোনও ওয়্যারহাউজ হয়নি। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে জায়গা দেওয়ার পরেই স্থাপনা হয়েছে।’ আর পিডি তো (প্রকল্প পরিচালক) গিয়ে এসব স্থাপনা গড়ে দেননি, বলে নিজের দায় সারতে চান তিনি।  

    প্রকাশিত: সোমবার ০২ আগস্ট ২০২২

    Post Top Ad

    Post Bottom Ad