• সর্বশেষ আপডেট

    অনেক পরিশ্রম আর ত্যাগ স্বীকারের ফল এই তাসকিন

     


    চোট ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে জাতীয় দল থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন তাসকিন আহমেদ। পথ হারানো এই পেসার জীবনের কঠিন বাস্তবতা উপলব্দি করতে খুব বেশি সময় নেননি। তিনি জানতেন, নিজের রাস্তায় ফিরে আসতে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। করোনাকালীন সময়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফিটনেস নিয়ে অনেক কাজ করেছেন, যেন পণ করেছিলেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার!আবিষ্কার তাসকিন করতে পেরেছেন, খুব ভালো করেই করতে পেরেছেন! আজ (বুধবার) তার আগুনে বোলিংয়ের সামনে খেই হারায় স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটাররা। 

    দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রোটিয়াদের ১৫৪ রানে অলআউট করে সিরিজ জেতার পথটা তৈরি করেছেন বদলে যাওয়া তাসকিনই।কাগিসো রাবাদার ব্যাট ছুঁয়ে যাওয়া বল মুশফিকুর রহিমের তালুবন্দি হতেই তাসকিনের ভোঁ-দৌড়। ৮ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা তাসকিন তো এই দিনটির অপেক্ষাই করছিলেন। বাইরের কন্ডিশনে ফাইফারের জন্য পাক্কা আট বছর অপেক্ষার পর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেঞ্চুরিয়নের ২২ গজে লাইন, লেন্থ, গতি, ইন সুইং, আউট সুইং, বাউন্সে প্রোটিয়া ব্যাটারদের পরাস্ত করে তুলে নেন বিদেশের মাটিতে প্রথম ৫ উইকেট। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ২০১৪ সালে অভিষেকে ৫ উইকেট পেয়েছিলেন তিনি। প্রথম দুই স্পেলে ৫ ওভারে নিয়েছিলেন ২ উইকেট। পেয়েছিলেন কাইল ভেরিয়েনে ও জানেমান মালানের উইকেট। পরবর্তীতে ফিরেই তার শিকার আরও ৩টি।

     ডোয়াইন প্রিটোরিয়াসকে আউট করার পর একই ওভারে ফেরান ডেভিড মিলার ও রাবাদাকে।এই তাসকিন আর সেই তাসকিনে পার্থক্য অনেক। ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েই তাসকিন উপলব্দি করতে পেরেছিলেন। ২০১৯ সালের ৭ জুন মিরপুরের একাডেমিতে ফিটনেস নিয়ে কাজ করতে আসা এই পেসার ততক্ষণে জেনে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ দলে তিনি নেই। সংবাদকর্মীদের প্রশ্ন ছিল, আপনার প্রতি কি সুবিচার করা হয়েছে? উত্তর দিতে গিয়ে গলা ধরে এসেছিল তাসকিনের।

     চোখ বেয়ে নেমেছিল অশ্রুধারা। তাসকিন আজও কেঁদেছেন। বিদেশের মাটিতে প্রথমবার ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫ উইকেট নিয়ে আনন্দাশ্রু ঝরেছে তার চোখে।এই তাসকিন বদলে যেতে অনেক পরিশ্রম আর ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ২০২০ সালের শুরুতে ওমরা করতে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। সেখান থেকে থেকে ফিরেই ‘নতুন’ তাসকিনের যাত্রা শুরু। তিনি উপলব্দি করেছিলেন এভাবে চলতে থাকলে হারিয়ে যাবেন।

     অভিষেকে ভারতের বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়ে আলোড়ন তোলা তাসকিন হেরে যাওয়ার পাত্র নন। কিন্তু ফিরে আসার মিশন শুরু করতেই দেশে করোনাভাইরাসের হানা!কিন্তু অন্য সবার মতো তিনি বসে থাকেননি। বিসিবি থেকে শুরু কবে পৃথিবীর সবপ্রান্তে ক্রিকেট যখন বন্ধ, তখন কঠোর পরিশ্রমে ডুব দেন। নিজের ফিটনেস ও বোলিং নিয়ে পরিশ্রম করতে থাকেন। বাসার গ্যারেজ, সিঁড়ি, ধানমন্ডি ৪ নম্বর মাঠ, বসিলার বালুর মাঠ থেকে শুরু করে জিম- সবখানেই ছিলেন সরব। মাইন্ড ট্রেনিংয়ের অংশ হিসেবে জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হেঁটেছেনও! বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া সব কিছুই কমিয়ে দেন।নির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা নিয়েই তাসকিন এগিয়েছেন।

     তার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন কোচ মাহবুব আলী জাকি। সবকিছুতেই তাসকিন ছিলেন নিখুঁত। ট্রেনার হিসেবে এক বডিবিল্ডার নিয়ে জিমে কাজ করেছেন, শরীর থেকে বাড়তি মেদ ঝরিয়ে ফেলেন। শর্ট অব লেংথ, অফ কাটার, ইন কাটার, পুরনো বলে রিভার্স সুইংসহ বোলিং বৈচিত্র্য বাড়াতে কাজ করেছেন দিনরাত। এই পরিশ্রমে গতি থেকে শুরু করে বৈচিত্র্য সবকিছুই বেড়েছে, এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে আগের চেয়ে অনেক পরিণত ক্রিকেট-মস্তিষ্ক।এসব মিলিয়ে তাসকিন হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের বড় এক অস্ত্র।

    তাসকিনের ক্রিকেট-মস্তিষ্ক কতটা সমৃদ্ধ হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেই সেটা বোঝা গেছে। ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝে বল করতে পারার ক্ষমতা তার মধ্যে বেশ ভালো করেই তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে চোখে আঙুল দিয়ে তিনি দেখিয়ে চলেছেন, এই তাসকিন কতটা ধারালো!


    প্রকাশিত: বুধবার ২৩ মার্চ ২০২২

    Post Top Ad

    Post Bottom Ad