• সর্বশেষ আপডেট

    রাজনৈতিক সংকট: আদালতে মিলতে পারে সমাধান

     

    দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সরকারে কে থাকবেন, সে বিষয়ে প্রায় অনড় অবস্থান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি)। অনড় অবস্থানের কারণে ভোটের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, রাজনীতির অঙ্গনে ততই বাড়ছে উত্তাপ।


    বিরোধীদের দাবি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার। তবে সরকারি দলের নেতারা বলছেন, অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানসম্মত নয়। আদালতই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছে। এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, আদালতের সিদ্ধান্তেই যেহেতু ব্যবস্থাটি বাতিল হয়েছে, সেহেতু একই পথে মিলতে পারে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান।


    রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর সঙ্গে গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টে বৈঠক করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তাঁদের মধ্যে একান্তে কী কথা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো পক্ষ অবশ্য মুখ খোলেনি।

    তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের আগ্রহেই পূর্বনির্ধারিত এ বৈঠকটি হয়েছে।সরকার, সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের অন্দরমহলে খোঁজখবর রাখে, এমন সূত্রগুলো বলেছে, বর্তমান জাতীয় সংসদের ২৯০ জন সদস্যের শপথ নেওয়া ও পদে থাকার বৈধতা নিয়ে রিট খারিজের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে করা একটি আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়েছে আপিল বিভাগে, গত ২৭ জুলাই। এ বিষয়ে সরকারি মহলে অস্বস্তি আছে। সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ সময়ে বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্যের পদে থাকার বৈধতার বিষয়টি আলোচনায় আসা সরকারের জন্য বিব্রতকর মনে করা হচ্ছে।

    ২৯০ জন সদস্যের শপথ নেওয়া ও পদে থাকার বৈধতা নিয়ে রিট খারিজের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চেয়ে করা আবেদনটির ওপর শুনানির বিষয়টি দুই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের–সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন–সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের মধ্যকার একান্ত আলাপে স্থান পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

    ২০১১ সালে প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে এক সংক্ষিপ্ত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সম্পর্কিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেন। তবে একই সঙ্গে রায়ে শান্তিশৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতার স্বার্থে পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে বলে আপিল বিভাগ মত দেন। আপিল বিভাগ পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ রায় দেওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনের সুযোগ না রেখে একই বছর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়।ফিরিয়ে আনা হয় রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা।

    সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, আপিল বিভাগ ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। এই রায় প্রকাশের আগেই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়ার পর রায়টি পুনর্বিবেচনার বিষয়টি আদালতে তোলা হয়নি। তাই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই সংবিধান সংশোধন করা হলেও রায়টি পুনর্বিবেচনার আইনি সুযোগ থাকলেও থাকতে পারে।

    এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক আজকের পত্রিকাকে বলেন, রাজনৈতিক ঐকমত্য হলে রায়ের আলোকে বিকল্প ব্যবস্থা সম্ভব। রিভিউ একটি পদ্ধতি হতে পারে। সব পক্ষের আইনজীবীদের বলতে হবে তাঁরা রিভিউ চান।

    আর সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, রাজনৈতিক ঐকমত্য হলে আদালতের মাধ্যমে বা সংসদে বিল এনে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্বাচনকালীন সরকারের সমাধান করা সম্ভব। এ জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে বর্তমানে প্রচলিত ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করতে হবে।

    এ ছাড়া রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনাও আছে, ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ আবার রাষ্ট্রপতি শাসন পদ্ধতিতে ফেরার কথা ভাবছেন। তেমনটি করতে চাইলে বর্তমান সংসদেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এ জন্য সংসদে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও ক্ষমতাসীনদের হাতে আছে। তারপরও সুপ্রিম কোর্ট যেহেতু সংবিধানের রক্ষক, সংবিধানে হাত পড়লে তাঁদের অবশ্যই ভূমিকা থাকবে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে পরিষ্কার করে কেউ কিছু বলছেন না। 


    প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুপ্রিম কোর্টে যান গতকাল বেলা দেড়টার দিকে। প্রায় আধা ঘণ্টা বৈঠক শেষে সুপ্রিম কোর্ট থেকে বেরিয়ে যান তিনি। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা, নির্বাচন কমিশন সচিব মো. জাহাংগীর আলম, যুগ্ম সচিব (আইন) মো. মাহবুবার রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে।

    বৈঠক শেষে বের হয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠকের কারণ জানতে চাইলে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি আমাদের শপথ পড়িয়েছেন। আমি বিচার বিভাগে ছিলাম। তিনি কিছুদিনের মধ্যেই অবসরে যাবেন। সে জন্য সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলাম।’

    কয়েকটি নির্বাচনী এলাকার সীমানাসহ উচ্চ আদালতে মীমাংসার অপেক্ষায় থাকা বিষয়ে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে সিইসি বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে কমিশনে ফিরে কথা বলবেন।

    কমিশনে ফেরার পর সিইসি কিংবা বৈঠক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। এর আগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করতে সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছালে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. গোলাম রব্বানী, হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার মুন্সি মশিয়ার রহমান, আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ সাইফুর রহমান, হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার তোফায়েল হোসেন, স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইন ও হাইকোর্ট বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার কাজী আরাফাত উদ্দিন।
    প্রকাশিত মঙ্গলবার ১ (আগস্ট) ২০২৩